রাজধানীর এক অভিজাত হোটেলের বলরুমে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে। সময় গড়িয়েছে বিকেল সাড়ে ৩টা। নির্বাচনের উত্তেজনা, প্রত্যাশা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনার বার্তা নিয়ে মঞ্চে ওঠেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের বিজয় ঘোষণা করে তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের।” তাঁর কণ্ঠে ছিল স্বস্তি, উচ্চারণে ছিল দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিধ্বনি।
দেড় দশক পর ‘জবাবদিহিমূলক সরকার’-এর প্রতিশ্রুতি
তারেক রহমান বলেন,
জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে সরাসরি ভোটের ভিত্তিতে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটকে তিনি শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বার্তা হিসেবে তুলে ধরেন।
দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র মেরামতের যে রূপরেখা বিএনপি জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিল, তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অকার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই নতুন যাত্রা শুরু হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভিন্নমতের মাঝেও ঐক্যের আহ্বান
বিজয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার বার্তা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, পথ ও মত ভিন্ন হলেও দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, “জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
সংযমের বার্তা ও আইনশৃঙ্খলার গুরুত্ব
নির্বাচন-পরবর্তী সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়াতে বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এ তথ্য জানিয়ে তারেক রহমান নেতাকর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। দল, মত, ধর্ম বা ভিন্নমত নির্বিশেষে দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে এবং কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না।
কৃতজ্ঞতা ও স্মরণ
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের ধন্যবাদ জানান বিএনপি চেয়ারম্যান। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের এক আবেগঘন অংশে তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদ ও হতাহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
এ সময় তিনি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-কে স্মরণ করে বলেন,
এমন এক আনন্দঘন সময়ে তাঁর অনুপস্থিতি দলকে ভারাক্রান্ত করেছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান জাতি কখনো ভুলবে না।
‘এখন দেশ গড়ার পালা’
বক্তব্যের শেষাংশে তারেক রহমান ভবিষ্যতের দিকেই দৃষ্টি ফেরান। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
“এখন দেশ গড়ার পালা”—এই বার্তায় শেষ হয় তাঁর বক্তব্য।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

২৩.৫১°সে