জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছে সরকার। ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন—এই এক বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ উপদেষ্টা এবং তাঁদের স্ত্রী বা স্বামীর মোট সম্পদ বেড়েছে। তবে এই তালিকায় ব্যতিক্রমও আছেন—কয়েকজন উপদেষ্টার ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র উঠে এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উপদেষ্টা পরিষদের ২৭ জন সদস্য ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের আর্থিক ও অআর্থিক সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যদিও এর পরের প্রায় আট মাসের সম্পদের পরিবর্তন এই বিবরণীতে নেই।
প্রধান উপদেষ্টা: সম্পদ বেড়েছে, স্ত্রীর কমেছে
প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মোট সম্পদ এক বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, ব্যাংক আমানতের মুনাফা এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ার—এই তিনটি কারণকে সম্পদ বৃদ্ধির মূল উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের নন-ফাইনান্সিয়াল সম্পদ কিছুটা বাড়লেও মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা কমেছে।
কারা এগিয়ে, কারা পিছিয়ে
এই এক বছরে সবচেয়ে বেশি সম্পদ বেড়েছে যাঁদের, তাঁদের মধ্যে আছেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান ও বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। আদিলুর রহমানের সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৫২ লাখ টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় দেড় কোটিরও বেশি। তাঁর স্ত্রীর সম্পদও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রায় একই অঙ্কে সম্পদ বেড়েছে বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের। চার কোটি ৪৬ লাখ টাকা থেকে তাঁর সম্পদ দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি ৮৩ লাখ টাকায়।
অর্থ, আইন, শিক্ষা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ আরও বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য বিবরণীতে রয়েছে। ব্যাংক আমানতের মুনাফা, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, পেশাগত আয়—এসবকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
টাকার অঙ্কে সবচেয়ে ধনী
টাকার হিসাবে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ৯১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেশি। এক বছরে তাঁর সম্পদ বেড়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাছাকাছি। তাঁর স্ত্রীর সম্পদও সামান্য বেড়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান। তবে তাঁর সম্পদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে অবস্থান করছে।
বিদেশে সম্পদ, বিদেশেই দায়
ড. খলিলুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর দেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ মাত্র ২২ লাখ টাকা। বিপরীতে দেশের বাইরে তাঁদের সম্পদের পরিমাণ ৪৬ মিলিয়নের বেশি মার্কিন ডলার। একই সঙ্গে বিদেশে ১২ লাখ ডলারের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে বিবরণীতে।
কমেছে যাঁদের সম্পদ
এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত ব্যতিক্রম পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এক বছরে তাঁর সম্পদ কমেছে এক কোটিরও বেশি। দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে নেমে এসেছে প্রায় এক কোটি ১২ লাখ টাকায়। তবে তাঁর স্বামীর সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।
এ ছাড়া উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদও কমেছে। কয়েকজন উপদেষ্টার ক্ষেত্রে নিজের সম্পদ সামান্য বাড়লেও জীবনসঙ্গীর সম্পদ কমেছে।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও তারকা স্ত্রীর সম্পদ
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নিজের সম্পদ কিছুটা কমেছে। তবে তাঁর স্ত্রী, অভিনেত্রী ও প্রযোজক নুসরাত ইমরোজ তিশার মোট সম্পদ বেড়ে প্রায় তিন কোটিতে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায়ও বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষার্থী উপদেষ্টাদের হিসাব
উপদেষ্টা পরিষদে থাকা শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সম্পদের তথ্যও আলাদা করে উঠে এসেছে।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
মাহফুজ আলমের সম্পদ এক বছরে তিন গুণের বেশি বেড়ে হয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।
তবে নাহিদ ইসলামের সম্পদের হিসাব এই তালিকায় নেই। পদত্যাগের পর তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আয়-ব্যয়ের বিবরণ প্রকাশ করেছিলেন।
যাঁদের তথ্য নেই কেন
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর সম্পদের তথ্য এই বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সরকার জানিয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের সময়কাল ও অবৈতনিক অবস্থানের কারণে তাঁদের ক্ষেত্রে সম্পদের বিবরণ দেওয়া হয়নি। তবে লুৎফে সিদ্দিকী সরকারি কোনো বেতন ভাতা গ্রহণ করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৩.৩৩°সে