জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র–এর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজন বা ফিজিক্যাল স্টার্টআপ (ফুয়েল লোডিং) কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।
ফিজিক্যাল স্টার্টআপ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, এই জ্বালানি সংযোজন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাতারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। বহু বছরের পরিকল্পনা, গবেষণা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়েই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানিতে পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব
মন্ত্রী বলেন, শিল্পায়ন ও আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি অপরিহার্য। পারমাণবিক শক্তি সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে এবং শিল্পখাত আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ভ্লাদিমির পুতিন, রাফায়েল গ্রসি এবং এলেক্সি লিখাচভ–সহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতিফলন
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেন, রূপপুর প্রকল্প কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় সক্ষমতার একটি বাস্তব প্রতিফলন। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করে বাংলাদেশ একটি নতুন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম–এর মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচভ বলেন, রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশ–রাশিয়া সহযোগিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও রোসাটমের মধ্যে সমন্বয় প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)–এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বলেন, বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে এটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক। দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে নিরবচ্ছিন্ন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিব সুইচ টিপে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগের প্রস্তুতি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে আগামী আগস্টের শুরুতে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে জানুয়ারি মাসে প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত হবে।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, এনপিসিবিএল, আইএইএ ও রোসাটমসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার পথে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও শিল্পায়নের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

২৩.৩৩°সে
