ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম শুক্রবার পরিণত হয়েছিল এক অনন্য উৎসবমুখর মিলনমেলায়। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা ক্ষুদে ফুটবলারদের পদচারণায় মুখর ছিল পুরো স্টেডিয়াম। তাদের চোখে ছিল বিজয়ের স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশের পতাকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরার প্রত্যয়। এমনই এক আবেগঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক-বালিকা)’-এর চূড়ান্ত পর্ব।
ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে হাজারো শিশুর উচ্ছ্বাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু খেলাধুলায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। কারণ খেলাধুলা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠবে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “খেলাধুলার পাশাপাশি সব কিছুতে পারদর্শী হলেই আমরা সুন্দর ও স্ট্রং বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।”
সরকারপ্রধানের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে শিশুদের বহুমাত্রিক বিকাশের প্রসঙ্গ। তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য শুধু ক্রীড়াবিদ তৈরি করা নয়; এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা জ্ঞান, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ হবে।
“যে গান করতে চায়, ছবি আঁকতে চায় কিংবা কোরআন তিলাওয়াত করতে চায়—সবার জন্য সুযোগ নিশ্চিত করা হবে,” বলেন তিনি।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারা একদিন বাংলাদেশের মাটিতেও জন্ম নিতে পারে। এজন্য প্রয়োজন ছোটবেলা থেকেই প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের যথাযথ পরিচর্যা করা।
তিনি শিশুদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা ও সংস্কৃতি চর্চায় দক্ষ হতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলতে পারব।”
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও ঘোষণা দেন, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ‘প্রাইম মিনিস্টার’স কাপ’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া চর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এবারের টুর্নামেন্ট ছিল দেশের তৃণমূল পর্যায়ের শিশুদের প্রতিভা বিকাশের এক বিরল উদাহরণ। দেশের ৬৫ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ধাপে ধাপে বাছাই শেষে চারটি বিদ্যালয় ফাইনালে জায়গা করে নেয়। দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক পথ পেরিয়ে ফাইনালে ওঠা এই শিক্ষার্থীদের সাফল্য শুধু তাদের নিজস্ব অর্জন নয়; এটি তাদের পরিবার, বিদ্যালয় ও এলাকারও গর্ব।
বালিকা বিভাগের শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অন্যদিকে বালক বিভাগের ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
খেলার উত্তেজনা, দর্শকদের করতালি আর শিশুদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে উৎসবের রূপ দেয়। মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও এ দিনটি হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার এক উপলক্ষ।
শিক্ষাবিদদের মতে, খেলাধুলা শুধু শারীরিক সক্ষমতাই বাড়ায় না; এটি নেতৃত্ব, দলগত কাজ, আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণাবলিও গড়ে তোলে। আর সেই কারণেই শিক্ষা ও খেলাধুলাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আর্মি স্টেডিয়ামের সবুজ মাঠে ক্ষুদে খেলোয়াড়দের দৌড় যেন এক নতুন বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, মাঠে, মঞ্চে, শিল্পে ও সংস্কৃতির প্রতিটি অঙ্গনেই বিকশিত হবে। আর সেই বহুমাত্রিক বিকাশের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে আগামী দিনের আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও বিশ্বমানের বাংলাদেশ।

২৩.৫১°সে



